
এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবি হয়তো কয়েক সেকেন্ডেই আমাদের আনন্দ দেয়। কিন্তু সেই ছবির পেছনে থাকা ডেটা সেন্টার, কুলিং সিস্টেম ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানির একটি বড় হিসাব।
যুগটা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। কয়েকটি ক্লিকেই বদলে যাচ্ছে ছবি। কেউ ফিরে যাচ্ছেন শৈশবে, কেউ আশির দশকের সাজে হাজির হচ্ছেন, আবার কেউবা নিজেকে দেখছেন একেবারে অন্য কোনো সময়ের মানুষ হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ট্রেন্ড এলেই তাতে মেতে ওঠেন নেটিজেনরা।
দেখতে মজার এসব ট্রেন্ডের আড়ালেও আছে অন্য এক বাস্তবতা। এআই দিয়ে ছবি তৈরি করতে যে ডেটা সেন্টারগুলোর প্রয়োজন হয়, সেগুলো পরিচালনা ও ঠান্ডা রাখতে পানি লাগে। এআই-এর ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে এর পানি ব্যবহারের প্রশ্ন।
তাহলে একটি এআই ছবি তৈরি বা সম্পাদনার পেছনে আসলে কতটা পানি খরচ হয়? এই পানি কোথা থেকে আসে? আর এআই-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের কারণে ভবিষ্যতে পানির ওপর কতটা চাপ তৈরি হতে পারে?
একটি ছবির পেছনে কতটা পানি?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয়, একটি এআই ছবি তৈরি করতে কয়েক লিটার পানি প্রয়োজন হয়। কোথাও বলা হয়, একটি ছবি তৈরিতে ২ থেকে ৫ লিটার পর্যন্ত পানি ব্যবহার হতে পারে।
তবে গবেষণা বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়।
২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ওয়াটার ইউজ অব ডেটা সেন্টার ওয়ার্কলোডস: আ রিভিউ অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট অব কি ডিটারমিন্যান্টস’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, এআই ডেটা সেন্টারের পানি ব্যবহারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। সার্ভারের দক্ষতা, ডেটা সেন্টারের অবস্থান, শীতলীকরণ প্রযুক্তি, আবহাওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধরনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পানির ব্যবহার নির্ভর করে।
অর্থাৎ প্রতিটি এআই ছবি বা প্রতিটি এআই প্রশ্নের উত্তরের জন্য একই পরিমাণ পানি খরচ হয় না। কারণ এখানে ডেটা সেন্টারের পরোক্ষ পানি ব্যবহারও হিসাবের মধ্যে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের গবেষক সামির এইচ. শাহের ২০২৬ সালে প্লস ওয়াটারে প্রকাশিত গবেষণায় ডেটা সেন্টারের পানি ব্যবহার স্থানীয় পানি নিরাপত্তার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণাটি দেখায়, বড় ডেটা সেন্টার বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করলে স্থানীয় পানির উৎসের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পানি সরবরাহের অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজন হলে তার খরচও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় ব্যবহারকারীদের ওপর পড়তে পারে। খরা কিংবা প্রতিকূল পরিবেশ দেখা দিলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পানি বণ্টনের সক্ষমতাও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেটা সেন্টার সরাসরি সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য পানি ব্যবহার করে। কিন্তু সেই ডেটা সেন্টার চালাতে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন, সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও পানি ব্যবহার হতে পারে। ফলে ডেটা সেন্টারের পরোক্ষ পানি ব্যবহার অনেক সময় তার সরাসরি পানি ব্যবহারের চেয়েও বড় হতে পারে।
এআই-এর পানি ব্যবহারের মোট হিসাব কত?
এআই-এর পানি ব্যবহারের একটি বড় সমস্যা হলো এর সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া কঠিন। ২০২৬ সালে প্যাটার্নস জার্নালে প্রকাশিত ‘দ্য কার্বন অ্যান্ড ওয়াটার ফুটপ্রিন্টস অব ডেটা সেন্টার্স অ্যান্ড হোয়াট দিস কুড মিন ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শীর্ষক গবেষণায় এআই-এর সম্ভাব্য পানি ও কার্বন ফুটপ্রিন্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী এআই সিস্টেমের ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট আনুমানিক ৩১২ দশমিক ৫ থেকে ৭৬৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন লিটার পর্যন্ত হতে পারে।
তবে এই সংখ্যাটিও চূড়ান্ত হিসাব নয়। এর অন্যতম কারণ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতিবেদনে এআই-এর পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ সাধারণত আলাদাভাবে প্রকাশ করে না। ফলে এআই-এর প্রকৃত পানি ব্যবহারের পরিমাণ নির্ধারণে এখনও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অর্থাৎ, এআই ডেটা সেন্টারগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পানি ব্যবহার করছে—এটি স্পষ্ট। কিন্তু ঠিক কতটা পানি ব্যবহার করছে, তার একটি নির্ভুল বৈশ্বিক সংখ্যা এখনও আমাদের হাতে নেই।
পানির ওপর চাপ কমানোর উপায় কী?
এআই-এর পানি ব্যবহারের প্রভাব কমাতে প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়েও কাজ চলছে। এর মধ্যে একটি হলো ডাইরেক্ট-টু-চিপ লিকুইড কুলিং। প্রচলিত শীতলীকরণ ব্যবস্থায় যেখানে পানির বাষ্পীভবনের মাধ্যমে তাপ সরানোর প্রয়োজন হতে পারে, ডাইরেক্ট-টু-চিপ পদ্ধতিতে সার্ভারের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোল্ড প্লেটের মধ্য দিয়ে কুল্যান্ট প্রবাহিত করা হয়।
চিপ থেকে তাপ শোষণ করার পর সেই তরল আবার শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঠান্ডা হয়ে ফিরে আসে। ফলে একই কুল্যান্ট একটি ক্লোজড লুপের মধ্যে বারবার ব্যবহার করা যায় এবং নিয়মিত পানি বাষ্পীভূত করে ফেলার প্রয়োজন কমে।
মাইক্রোসফটের নতুন এআই-অপ্টিমাইজড ডেটা সেন্টার ডিজাইনে এমন ক্লোজড-লুপ, চিপ-লেভেল কুলিং ব্যবহারের কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মাইক্রোসফটের হিসাব অনুযায়ী, এই নকশা প্রতি ডেটা সেন্টারে বছরে ১২৫ মিলিয়ন লিটারের বেশি কুলিং ওয়াটার ব্যবহারের প্রয়োজন এড়াতে পারে।
অর্থাৎ এআই-এর পানির ব্যবহার কমানোর চেষ্টা শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই; ডেটা সেন্টারের শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার পদ্ধতিতেও এর সমাধান খোঁজা হচ্ছে।
শুধু এআই-ই কি দায়ী?
এআই-এর পানি ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী মিঠা পানির ওপর চাপ তৈরির জন্য এআইকে একমাত্র দায়ী করা যাবে না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) অ্যাকোয়াস্ট্যাট তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মিঠা পানির প্রায় ৭২ শতাংশ কৃষি খাতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ সেচসহ কৃষিকাজেই মিঠা পানির সবচেয়ে বড় অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে।
এর পর রয়েছে শিল্প ও জ্বালানি খাত। ফলে বিশ্বে পানির ওপর চাপ তৈরির চিত্রটি এআই আসার অনেক আগের। তবে এর অর্থ এই নয় যে এআই-এর পানি ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বহীন। বরং এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়।
কৃষি, শিল্প ও জ্বালানি ইতিমধ্যেই যেসব খাত বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করছে, তার পাশাপাশি দ্রুত বাড়ছে এআই-এর অবকাঠামো। ফলে প্রশ্নটি শুধু এআই কতটা পানি ব্যবহার করছে, তা নয়; বরং ইতিমধ্যে পানির ওপর প্রচণ্ড চাপ থাকা পৃথিবীতে এআই-এর দ্রুত বিস্তার সেই চাপকে আর কতটা বাড়িয়ে তুলছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: সানজিদা আক্তার
মন্তব্য করুন