
একটি স্বপ্ন, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সৃজনশীলতার প্রতি গভীর ভালোবাসা—এই তিন শক্তিকে সঙ্গী করেই নিজের পরিচয় তৈরি করছেন তরুণ উদ্যোক্তা আফরিদা হুমায়রা চৌধুরী। একজন শিক্ষার্থী হয়েও তিনি হাতে গড়া শিল্পকে শুধু শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সেই ভালোবাসাকে রূপ দিয়েছেন একটি সৃজনশীল ব্র্যান্ডে—‘আফ্রি’স ক্রিয়েশন’।
আজ আফ্রি’স ক্রিয়েশন শুধু একটি হ্যান্ডমেড আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট পেজ নয়; এটি মৌলিক শিল্পচর্চা, নান্দনিকতা এবং স্মৃতিকে শিল্পে রূপ দেওয়ার এক অনন্য উদ্যোগ। প্রতিটি শিল্পকর্মে ফুটে ওঠে প্রতিষ্ঠাতা আফরিদা হুমায়রা চৌধুরীর শিল্পবোধ, ধৈর্য, নিষ্ঠা এবং নিজস্ব সৃজনশীল চিন্তার ছাপ।
ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি ও সৃজনশীল কাজের প্রতি ছিল আফরিদা হুমায়রা চৌধুরীর গভীর আগ্রহ। তবে করোনা মহামারির সময় ঘরে অবস্থানকালে বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় তিনি নতুন করে আর্ট ও ক্রাফটের জগতে প্রবেশ করেন।
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই সম্পূর্ণ সেলফ-টট হিসেবে তিনি নিজেই রেজিন আর্ট, ক্লে আর্ট, বিড ওয়ার্ক, জুয়েলারি মেকিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। দীর্ঘ অনুশীলন, ধৈর্য এবং নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন।
আফরিদা হুমায়রা চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত আফ্রি’স ক্রিয়েশন মূলত রেজিন আর্টভিত্তিক একটি হ্যান্ডমেড ব্র্যান্ড। পাশাপাশি এখানে তৈরি হয় ক্লে আর্ট, হ্যান্ডমেড চুড়ি, বিড ওয়ার্ক, সুতার কাজ, কাস্টম জুয়েলারি, নেকলেস, কী-রিং, বুকমার্ক এবং নানা ধরনের ইউনিক হ্যান্ডক্রাফটেড পণ্য।
তার মতে, “প্রতিটি সৃষ্টি শুধু একটি পণ্য নয়, এটি একজন শিল্পীর সময়, শ্রম, অনুভূতি ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।”
আফরিদা হুমায়রা চৌধুরীর সবচেয়ে বড় বিশ্বাস—শিল্পের সৌন্দর্য তার মৌলিকতায়। এই বিশ্বাস থেকেই আফ্রি’স ক্রিয়েশনের অনেক শিল্পকর্ম ‘ওয়ান অব ওয়ান’ ধারণায় তৈরি করা হয়। অর্থাৎ একটি ডিজাইনের মাত্র একটি আসল পিস তৈরি করা হয় এবং সেটি বিক্রি হয়ে গেলে সাধারণত সেই নকশা দ্বিতীয়বার তৈরি করা হয় না। এর ফলে একজন ক্রেতা কেবল একটি পণ্য নয়, বরং একটি একক ও দুর্লভ শিল্পকর্মের মালিক হওয়ার সুযোগ পান।
আফরিদা হুমায়রা চৌধুরীর অন্যতম ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হলো স্মৃতিবিজড়িত ফুল রেজিনে সংরক্ষণ। প্রিয় মানুষের দেওয়া ফুল, বিয়ের তোড়া কিংবা জীবনের বিশেষ মুহূর্তের স্মৃতিকে রেজিনের মাধ্যমে স্থায়ী শিল্পকর্মে রূপ দেওয়া হয়। সময়ের সঙ্গে ফুলের সৌন্দর্য ম্লান হলেও সেই স্মৃতি যেন অমলিন থাকে—এই ভাবনা থেকেই তিনি এই বিশেষ সেবাটি চালু করেছেন।
শুরুর দিকে খুব বেশি মানুষ তার কাজ চিনতেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজের প্রচার হলেও সাড়া ছিল সীমিত। অনেক সময় হতাশাও এসেছে।
পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষা এবং ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে কিছু সময় কাজ থেকে দূরে থাকতে হলেও তিনি কখনো নিজের স্বপ্ন থেকে সরে যাননি। বরং প্রতিটি বাধাকে নতুন করে শেখার সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন।
বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে আফরিদা হুমায়রা চৌধুরী তার শিল্পকর্ম সরাসরি মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। দর্শনার্থীদের প্রশংসা, ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং ক্রেতাদের সন্তুষ্টিই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তার বিশ্বাস, হাতে তৈরি শিল্পকর্মের আবেদন কখনো কমবে না, কারণ প্রতিটি কাজের মধ্যেই থাকে একজন শিল্পীর আত্মার স্পর্শ।
বর্তমানে আফ্রি’স ক্রিয়েশনের পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। তবে আফরিদা হুমায়রা চৌধুরীর স্বপ্ন আরও বড়।
তিনি চান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের হ্যান্ডমেড শিল্পকে নতুন পরিচয়ে তুলে ধরতে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আফ্রি’স ক্রিয়েশনকে একটি বিশ্বস্ত ও সম্মানজনক বাংলাদেশি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই তার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য।
আফরিদা হুমায়রা চৌধুরীর বিশ্বাস, একটি হাতে তৈরি শিল্পকর্ম শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়; এটি মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি ও ভালোবাসারও বাহক।
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিটি সৃষ্টি নিজের হাতে যত্ন নিয়ে তৈরি করেন। আর সেই আন্তরিক প্রচেষ্টাই ধীরে ধীরে আফ্রি’স ক্রিয়েশনকে একটি সম্ভাবনাময় বাংলাদেশি হ্যান্ডমেড ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত করে তুলছে।
একজন তরুণ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ অনেকের অনুপ্রেরণার গল্প। সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস থাকলে স্বপ্ন যে বাস্তবে রূপ নেয়, তারই উজ্জ্বল উদাহরণ আফরিদা হুমায়রা চৌধুরী এবং তার গড়ে তোলা ‘আফ্রি’স ক্রিয়েশন’।
মন্তব্য করুন