
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কাঁচা দুধ, প্যাকেটজাত তরল ও গুঁড়া দুধসহ বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্যে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের সাম্প্রতিক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। পরীক্ষা করা মোট ৪১টি নমুনার প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তরল ও গুঁড়া দুধে। প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি কণা পাওয়া যায়। তুলনায় কাঁচা দুধে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি কণা শনাক্ত হয়েছে।
‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস কনটামিনেশন অব মিল্ক অ্যান্ড মিল্ক প্রোডাক্টস ইন বাংলাদেশ: ক্যারেক্টারাইজেশন, ডায়েটারি এক্সপোজার অ্যান্ড রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক এই গবেষণাটি দেশের দুগ্ধজাত খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে প্রথম বিস্তৃত কাজ বলে দাবি করেছেন গবেষকেরা। গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন সানাউল্লাহ মাজুমদার।
গবেষণায় অংশ নেওয়া দলের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন রেহেনুমা তারান্নুম, মো. মোশিউজ্জামান আদনান, তানজুম কবির খুকু, মো. রাসেল আলী, শাহুদা ইসলাম সোয়া, মো. আবদুর রাকিব, আলম তাজ আরা অর্থী, মো. মামুন ইসলাম ও মো. ওমর ফারুক। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অনুদানে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
গবেষকেরা জানান, শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। শরীরের ওজন কম এবং দুধের ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের হার বেশি হতে পারে। বিশেষ করে ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ পাওয়া গেছে।
গবেষণার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল—ঢাকা, যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, রাজশাহী, রংপুর ও চট্টগ্রাম থেকে কাঁচা দুধ সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি বাজার ও সুপারশপ থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য সংগ্রহ করা হয়।
পরীক্ষাগারে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়। মাইক্রোস্কোপ এবং ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি (এফটিআইআর) পদ্ধতির মাধ্যমে কণাগুলোর রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় পাওয়া অধিকাংশ কণা ছিল স্বচ্ছ, আঁশের মতো এবং আকারে ২৫০ মাইক্রোমিটারের কম। কাঁচা দুধে প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং ব্র্যান্ডের দুধে ৮২ শতাংশের বেশি কণা ছিল আঁশ আকৃতির।
পিটিএফই (টেফলন), পিইটি, নাইলন-৬, পলিইথিলিন, পিডিএমএস, পিপিএস, পিভিসি, পলিপ্রোপিলিন ও পলিস্টাইরিনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমারও শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, দুধ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার কারণেই এই দূষণ ঘটতে পারে। প্যাকেট, বোতল, পাইপলাইন, যন্ত্রপাতি, এমনকি কারখানার পরিবেশ থেকেও এসব কণা দুধে প্রবেশ করতে পারে।
তবে কোন উৎস থেকে কত পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক এসেছে, তা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
এই গবেষণার ফলাফল খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মন্তব্য করুন