
নেপালে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর দুর্যোগটির প্রকৃত কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পাহাড়ি জনপদে নেমে আসা প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। তবে এত দ্রুত ও ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত কোথা থেকে এবং কীভাবে হলো, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি নেপাল ও চীন।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমবাহ থেকে পাথর ও বরফধস, হিমবাহ হ্রদের পানি আকস্মিকভাবে বেরিয়ে আসা কিংবা অতিবৃষ্টির মতো একাধিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এর মাত্র তিন মিনিট পর, সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যার খবর পাওয়া যায়। তবে ভূমিকম্পের সঙ্গে বন্যার কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো যাচাই করা হয়নি।
এদিকে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিশ্লেষণে ভিন্ন একটি সম্ভাবনা সামনে এসেছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহ এলাকায় পাথরধসের পর ধ্বংসাবশেষসহ পানি লহেন্দে নদীতে প্রবেশ করতে পারে। পরে সেই পানি তিমুরে হয়ে ত্রিশূলী নদীতে পৌঁছায়।
তবে এ তথ্যও এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত নয়। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক ও ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
লাসায় নিযুক্ত নেপালের কনসাল জেনারেল লক্ষ্মী প্রসাদ নিরাউলা জানিয়েছেন, বন্যার সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও চীনা কর্তৃপক্ষও এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। তাদের ধারণা, হিমবাহ থেকে হঠাৎ পানি বেরিয়ে আসার ঘটনা কিংবা ভারী বৃষ্টিপাত—দুটিই সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
এরই মধ্যে বন্যার কারণ অনুসন্ধানে স্যাটেলাইট তথ্য ও স্থানীয় সূত্র বিশ্লেষণ করছে তিব্বতের কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার মানস সরোবর ও আলি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল বলেও জানা গেছে।
নেপাল সরকারের সামনে এখন শুধু বন্যার কারণ শনাক্ত করাই নয়, সীমান্তের কোন এলাকা থেকে এই ভয়াবহ স্রোতের উৎপত্তি হয়েছে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনা হিমবাহ হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যা বা ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ (জিএলওএফ) ঝুঁকির বিষয়টিকে আবারও সামনে এনেছে। গত বছর একই অঞ্চলে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে আকস্মিক ঢলে প্রাণহানি ও ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
ওই ঘটনার পর সীমান্তবর্তী বন্যা ও ভূমিধসের বিষয়ে নেপাল ও চীনের মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান এবং আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হলেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। ফলে নতুন এই দুর্যোগে সীমান্ত অঞ্চলে কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এদিকে ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে নেপাল সরকার। নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিপর্যয়ের পর নেপালকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে ভারত ও চীন। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকও উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্গঠনে সহযোগিতার আগ্রহ জানিয়েছে। ভারত জরুরি ত্রাণসামগ্রী, ওষুধ ও উদ্ধার সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে নেপাল সরকার।
বিশ্বব্যাংকও জরুরি সহায়তার জন্য সর্বোচ্চ ২৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি পর্যন্ত অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে এই অর্থ ঋণ, অনুদান নাকি অন্য কোনো ব্যবস্থায় দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট
মন্তব্য করুন