
নৃত্য ও কণ্ঠশিল্প—দুটি ভিন্ন মাধ্যমে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন জয়িতা রশীদ। মঞ্চে নৃত্যের মাধ্যমে যেমন অনুভূতি প্রকাশ করেন, তেমনি কণ্ঠের অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন ভয়েসওভার শিল্পী হিসেবেও।
খুলনায় গ্রামের বাড়ি হলেও ঢাকাতেই বেড়ে ওঠা জয়িতার নৃত্যের সঙ্গে পথচলা শুরু মাত্র তিন বছর দুই মাস বয়সে। ছোটবেলায় নাচের প্রতি খুব একটা আগ্রহ না থাকলেও মায়ের অনুপ্রেরণায় ধীরে ধীরে নৃত্যই হয়ে ওঠে তার ভালোবাসার জায়গা। মা-ই ছিলেন তার প্রথম নৃত্যশিক্ষক।
দীর্ঘদিনের নৃত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি ‘স্বর্ণ মুকুট নৃত্যরত্ন পুরস্কার ২০২৫’ অর্জন করেছেন জয়িতা। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, প্রায় চার বছর পর কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সেটিও করেছেন একেবারে প্রস্তুতিহীন অবস্থায়। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার খবর পান আগের রাতেই। পরে এক সিনিয়রের অনুরোধে শেষ মুহূর্তে মঞ্চে উঠে ডান্স সেগমেন্টে অংশ নিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
জয়িতার কাছে এই পুরস্কার শুধু একটি অর্জন নয়, বরং দীর্ঘদিনের নৃত্যচর্চার স্বীকৃতি। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কোনো প্রত্যাশা না থাকায় বিজয়ের আনন্দও ছিল তার কাছে আলাদা।
নৃত্যের পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই কণ্ঠ অনুকরণের প্রতি আগ্রহ ছিল জয়িতার। কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ নকল করে পরিবারের সদস্যদের শোনানো ছিল তার শৈশবের অন্যতম আনন্দ। সেই শখই পরে তাকে নিয়ে যায় ভয়েসওভারের জগতে।
২০২০ সালের করোনাকালে অনলাইনভিত্তিক একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ আসে তার। অন্যদের কণ্ঠ অনুকরণ দেখে জয়িতার মনে হয়, কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম কাজ হচ্ছে। মায়ের উৎসাহে ক্যামেরার সামনে তৈরি করেন প্রথম ভিডিও। সেখান থেকে পাওয়া ইতিবাচক সাড়া তাকে নিয়মিত ভয়েসওভার কাজের দিকে এগিয়ে দেয়।
জয়িতার মতে, ভয়েসওভার শুধু সুন্দর কণ্ঠে কথা বলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভিনয়, আবেগ ও এক্সপ্রেশন। চরিত্র অনুযায়ী কণ্ঠের টোন, পিচ ও বলার ধরন পরিবর্তন করাই এই কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সংগীতচর্চাও তার ভয়েসওভার দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। নৃত্যের পাশাপাশি সুজিত মোস্তফার কাছে গান শেখা এবং নিয়মিত রেওয়াজের মাধ্যমে কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস তৈরি করেছেন তিনি।
তবে ভয়েসওভারে পথচলার চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিশেষ করে সঠিক বাংলা উচ্চারণ, আবেগ ধরে রাখা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্ক্রিপ্ট উপস্থাপনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন জয়িতা। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করায় বাংলা উচ্চারণ শুদ্ধ করতে তাকে বাড়তি অনুশীলনও করতে হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কণ্ঠ অনুকরণের প্রসঙ্গেও জয়িতা মনে করেন, প্রযুক্তি অনেক দূর এগোলেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ও চরিত্র বুঝে অভিনয় করার জায়গাটি এখনও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
নাচ ও ভয়েসওভার—দুটি মাধ্যমকে আলাদা মনে হলেও জয়িতার কাছে দুটির মূল জায়গা একই। তার ভাষায়, “আমি যখন নাচি, তখন আমার শরীর কথা বলে; আর যখন ভয়েসওভার করি, তখন আমার কণ্ঠ কথা বলে।”
পড়াশোনা ও ব্যস্ততার মাঝেও নৃত্যচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন জয়িতা। দীর্ঘ সময় না পেলেও অল্প অবসরকে কাজে লাগিয়ে অনুশীলন কিংবা ডান্স ভিডিও তৈরি করেন তিনি।
আগামী দিনে কোনো কার্টুন চরিত্রের আনুষ্ঠানিক কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি নিজের একটি স্বতন্ত্র চরিত্র বা কণ্ঠ তৈরি করতে চান জয়িতা। এমন একটি পরিচয় গড়ে তুলতে চান, যা ভবিষ্যতে অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।
নৃত্যের মঞ্চ থেকে ভয়েসওভারের জগৎ—দুটি ভিন্ন পথকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করছেন জয়িতা রশীদ। প্রতিভা, অনুশীলন আর মায়ের অনুপ্রেরণাকে সঙ্গে নিয়ে শিল্পের জগতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
মন্তব্য করুন