
আইন শিক্ষাকে শুধু পাঠ্যবই, ধারা ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আদালতের বাস্তব কার্যক্রমের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ল’ অ্যান্ড জুরিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (ব্লাজা)-এর উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ব্লাজা ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইউনিটের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোর্ট ভিজিট প্রোগ্রাম-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ব্লাজা কর্তৃক এই আয়োজনে ব্লাজা ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইউনিটের আদালত পরিদর্শনে শিক্ষার্থীরা ঢাকা জজ কোর্টের বিভিন্ন বিচারিক কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান। মামলার শুনানি, আইনজীবীদের বক্তব্য ও যুক্তি উপস্থাপন, আদালতের শিষ্টাচার, বিচারিক পরিবেশ এবং একজন আইনজীবীর পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে তারা বাস্তব ধারণা লাভ করেন।
শ্রেণিকক্ষে অর্জিত তাত্ত্বিক জ্ঞানকে আদালতের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এ আয়োজন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা সরাসরি বিভিন্ন আদালতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি একটি মামলা কীভাবে শুনানির পর্যায়ে এগিয়ে যায়, আইনজীবীরা কীভাবে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং বিচারিক পরিবেশে কী ধরনের পেশাগত আচরণ বজায় রাখতে হয়—এসব বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
কোর্ট ভিজিট চলাকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইন পেশা সম্পর্কে জানার আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। আদালতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় ও দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আইন পেশার সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ, পেশাগত দায়িত্ব এবং একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করার বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির পরিচিত মুখ ও ব্লাজা কেন্দ্রীয় পরিষদের সভাপতি এডভোকেট সোমাইয়াদ শাহরিয়া ফিদা, ব্লাজা কেন্দ্রীয় পরিষদের উপদেষ্টা প্যানেলের সম্মানিত উপদেষ্টা এডভোকেট জালাল উদ্দীন রুমি, এডভোকেট রায়হান গাজী, ব্লাজা কেন্দ্রীয় পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনির আহমেদ-সহ আরও কয়েকজন তরুণ ও মেধাবী আইনজীবী।
বিশেষ করে এডভোকেট জালাল উদ্দীন রুমি শিক্ষার্থীদের আইনি বিশ্লেষণ, আইন অধ্যয়ন, ভবিষ্যৎ পেশাগত প্রস্তুতি এবং একজন দক্ষ আইনজীবী হওয়ার জন্য করণীয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক আলোচনা শিক্ষার্থীদের আইন পেশার বাস্তবতা সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা দেয়।
অন্যদিকে এডভোকেট সোমাইয়াদ শাহরিয়া ফিদা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আদালতে নিয়ে গিয়ে বিচারিক কার্যক্রম ও মামলার শুনানি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দেন। পরবর্তীতে আদালতে প্রত্যক্ষ করা বিষয়গুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা ও আলোচনা করেন তিনি। এতে শিক্ষার্থীদের কাছে আদালতের কার্যক্রম আরও বোধগম্য হয়ে ওঠে।
কোর্ট ভিজিটে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জানান, আদালতের কার্যক্রম বইয়ে পড়ার চেয়ে সরাসরি প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন আইনজীবী কীভাবে মামলা পরিচালনা করেন, কীভাবে যুক্তি উপস্থাপন করেন, বিচারকের সামনে কীভাবে বক্তব্য দিতে হয় এবং আদালতের পরিবেশে কী ধরনের শিষ্টাচার বজায় রাখতে হয়—এসব বিষয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, আইন পেশায় সফল হতে শুধু মেধা ও আইন সম্পর্কে জ্ঞান থাকলেই হবে না; এর পাশাপাশি সততা, ন্যায়বোধ, পেশাগত নৈতিকতা, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস, নিয়মিত অধ্যয়ন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। একজন আইনজীবীর দায়িত্ব শুধু আদালতে যুক্তি উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করাও তাঁর অন্যতম প্রধান কর্তব্য।
শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি বাস্তবভিত্তিক ও শিক্ষণীয় আয়োজন করায় বাংলাদেশ ল’ অ্যান্ড জুরিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (ব্লাজা)-এর সভাপতি এডভোকেট সোমাইয়াদ শাহরিয়া ফিদা এবং ব্লাজা ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইউনিটের সভাপতি রেজওয়ানা লিয়া ও সাধারণ সম্পাদক মোজাহিদ আবিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আইন শিক্ষাকে আরও কার্যকর, সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী করতে নিয়মিত আদালত পরিদর্শন, অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়, মামলার নথি বিশ্লেষণ, মুট কোর্ট এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মতো কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আইন পেশার জন্য তাদের আরও দক্ষ ও প্রস্তুত করে তুলবে।
ঢাকা জজ কোর্ট পরিদর্শন তাই শিক্ষার্থীদের কাছে নিছক একটি আদালত ভ্রমণ নয়; বরং এটি ছিল শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব আদালত, বিচারিক প্রক্রিয়া ও পেশাগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক অধ্যায়। আগামীর আইনাঙ্গনে নেতৃত্ব দিতে যাওয়া এসব তরুণ আইন শিক্ষার্থীর মেধা, সততা, ন্যায়বোধ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের আইন ও বিচারাঙ্গন আরও সমৃদ্ধ হবে—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।
মন্তব্য করুন