
একদিকে চলমান সশস্ত্র সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়, অন্যদিকে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব—দুই সংকটে বিপর্যস্ত গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি ও উত্তর কিভু প্রদেশের বাসিন্দারা। কয়েক মাসের ব্যবধানে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ এপ্রিল প্রথম পরিচিত সন্দেহভাজন রোগী হিসেবে চিহ্নিত এক স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়। পরে ১৫ মে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করে।
ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (ইসিডিসি) ৮ অক্টোবর প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ডিআর কঙ্গোতে ইবোলায় আক্রান্ত ৮ হাজার ৭২৮ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। এ সময়ে মারা গেছেন ৪ হাজার ২০৫ জন। এ ছাড়া ১ হাজার ৬৬ জন রোগীকে আইসোলেশনে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের পরিসংখ্যানের তুলনায় নতুন করে ৬৩টি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে এবং ২৭ জনের মৃত্যুর তথ্য যুক্ত হয়েছে। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ইতুরি প্রদেশে ৩৩ জন এবং উত্তর কিভু প্রদেশে ৩০ জন রয়েছেন।
দেশটির সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত প্রদেশ ইতুরি। প্রদেশটির ৩৬টি স্বাস্থ্য অঞ্চলের মধ্যে ২৮টিতে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। এসব অঞ্চলে মোট ৬ হাজার ৫১৩টি সংক্রমণ এবং ৩ হাজার ৭টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় সর্বাধিক আক্রান্ত প্রদেশ উত্তর কিভু। সেখানকার ৩৪টি স্বাস্থ্য অঞ্চলের মধ্যে ১৭টিতে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এসব অঞ্চলে মোট ১ হাজার ৭৮৫টি সংক্রমণ এবং ১ হাজার ২১টি মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। ইসিডিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ প্রদেশে নিশ্চিত আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর অনুপাত প্রায় ৫৭ শতাংশ।
এ ছাড়া আরও সাতটি প্রদেশের ১৬৭টি স্বাস্থ্য অঞ্চলের মধ্যে ৬৪টিতে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। ফলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ভাইরাসটির বিস্তার জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইবোলা ভাইরাসের একটি প্রজাতি বুন্দিবুগিও ভাইরাসের সংক্রমণে এ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ফলখেকো বাদুড়কে এ ভাইরাসের সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, দেহরস বা দূষিত বস্তু ও উপকরণের সংস্পর্শের মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।
সংক্রমণের পর সাধারণত ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, ক্লান্তি, পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা ও গলাব্যথা। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডিআর কঙ্গোতে এর আগে এত বেশি নিশ্চিত ইবোলা সংক্রমণ নথিভুক্ত হয়নি। ২০২৬ সালের মে মাসে শনাক্ত হওয়া এই প্রাদুর্ভাব দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ইবোলা প্রাদুর্ভাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি দেশটিতে বুন্দিবুগিও ভাইরাসজনিত রোগের দ্বিতীয় প্রাদুর্ভাব।
সংক্রমণের ধারাবাহিক বিস্তার, বিপুলসংখ্যক মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বিশেষ করে যেসব স্বাস্থ্য অঞ্চলে সংক্রমণ সক্রিয় রয়েছে, সেখানে বসবাসকারী ও যাতায়াতকারী মানুষের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
এ পরিস্থিতিতে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, আক্রান্ত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মন্তব্য করুন